করোনার ঝুঁকি মোকাবেলায় তামাক কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ করা জরুরি
মো. আবু রায়হান ॥ তামাক একটি মারাত্মক ক্ষতিকর নেশাদ্রব্য। বিশেষ করে, ধূমপান করোনায় আক্রান্তের ঝুঁকি ১৪ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে তোলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ বারবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, ধূমপায়ী/তামাক সেবনকারীরা নানারকম স্বাস্থ্য সমস্যাসহ জটিল ও কঠিন রোগাক্রান্ত হয়ে থাকে বিধায় COVID-19 বা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এবং প্রাণহানির ঝুঁকিতে শীর্ষে অবস্থান করছে।
 
কারণ হিসেবে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সিগারেট সেবনের হাতের আঙুলগুলো ঠোঁটের সংস্পর্শে আসে এবং এর ফলে হাতে (বা সিগারেটের ফিল্টারে) লগে থাকা ভাইরাস মুখে চলে যাবার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়। এছাড়া ধূমপায়ীদের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যায় ও ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেশি – যা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। তদুপরি, ধূমপান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্রমেই হ্রাস পায় বিধায়, সহজেই ক্ষতিকর ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকেন। এমনকি অকাল অকাল মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে।
 
সম্প্রতি চীনে এক জরিপে দেখা গেছে, করোনাভাইরাস সংক্রমিত প্রতি ১০০ জন পুরুষদের মধ্যে মৃত্যু হয় ২ দশমিক ৮ জনের। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে এই হার অনেকটাই কম। প্রতি ১০০ জন COVID-19 আক্রান্তের মধ্যে মারা যায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ। সামঞ্জস্যপূর্ণ চিত্র দেখা যায় ইতালিতেও। চীনের স্বাস্থ্য গবেষণা এজেন্সি বলছে, COVID-19 এ মৃতদের ৭০ শতাংশই পুরুষ। বিশেষজ্ঞরা এর পেছনে ধূমপানকেই অন্যতম বড় কারণ মনে করছেন। উল্লেখ্য, চীন ও  ইতালিতে পুরুষদের মধ্যে ধূমপায়ীর হার বেশি।
 
ইতোমধ্যে চীন, ইতালি, ফ্রান্সে COVID-19 সংক্রমণে মৃতদের মধ্যে অধিকাংশই ধূমপায়ী ছিলো বলে গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে, যা সারা বিশ্বের জন্য বড় সতর্কবার্তা। ইতোমধ্যে, কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় দক্ষিণ আফ্রিকা, ফিলিপাইনসহ পৃথিবীর অনেক দেশ সিগারেট বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। আবার চেক রিপাবলিকসহ পৃথিবীর অনেক দেশ জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বেরুনো নাগরিকদের সার্বক্ষনিক মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করছে। ধূমপানের জন্যও মাস্ক খোলা যাবে না। 
 
সরকারি তথ্যমতে, করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে এখনও মারাত্মক আকার ধারণ করেনি, তবে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কারণ, বিশ্বের শীর্ষ ১০টি তামাক সেবনকারীদেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭ এ দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৫ বছর ও তদুর্ধ বয়সীদের ৩ কোটি ৭৮ লাখ (৩৫.৩%) মানুষ কোন না কোন তামাক ব্যবহার করে। ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ বা ১৮% জনগোষ্ঠী ধূমপান করে। এতে দেখা যায়, চলমান করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবে দেশের কয়েক কোটি মানুষ উচ্চমাত্রার স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। সরাসরি ধূমপায়ী/তামাকসেবীর চাইতেও বেশি মানুষ বাসা, কর্মস্থল, গণপরিবহনে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। পরোক্ষ ধূমপানও ফুসফুসের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, ফুসফুস ও  শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। সুতরাং পরোক্ষ ধূমপানের শিকার মানুষেরও করোনা ঝুঁকিমুক্ত নয়। 
 
করোনা ভাইরাস ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশেও মহামারী আকার ধারণ করছে। করোনা মহামারী রোধে সরকার পুরো দেশ ‘শাটডাউন’ করেছে, এর আওতায় জরুরি সেবা ও পণ্য খাত ব্যতিত সকল সরকারি, বেসরকারি অফিস, কলকারখানা বন্ধ করা হয়েছে। বলা যায়, দেশের পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা ও কর্মমখী সেক্টরগুলো স্থবীর। এছাড়া অনেক জেলা-উপজেলা পৃথকভাবে ‘লকডাইন’ করা হয়েছে। প্রয়োজনে জরুরী অবস্থাও ঘোষণা করা হতে পারে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। 
 
এমন দুর্যোগকালীন সময়ে পরিস্থিতি সামলাতে সরকার সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। দেশে হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ, ভেন্টিলেশন, ডাক্তারদের সুরক্ষা সামগ্রীর স্বল্পতা এবং গণমানুষের অসচেতনতা তো আছে সেইসাথে করোনা মহামারী সামলাতে সরকারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রমেই সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট।
 
আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রী মহোদয় ক’দিন আগে চিকিৎসকদের এক অনুষ্ঠানে হয়তো অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেছিলেন, “করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাকে জাতীয় কমিটির প্রধান করা হলেও কখন ফ্যাক্টরী/শিল্প প্রতিষ্ঠান খোলা-বন্ধ হবে জানি না, কোন রাস্তা কখন বন্ধ হবে আর কখন খোলা হবে জানি না, মসজিদে কিভাবে নামাজ হবে তাও জানি না। একমাত্র স্বাস্থ্য বিষয় বাদে অন্য কোন বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপস্থিতি নেই!” স্বাস্থ্য মন্ত্রীর বক্তব্যে পরিস্কার, করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয় কতটা মজবুত!
 
এর আরেকটি নিকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে, শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক বৃটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) ও জাপান টোব্যাকো কোম্পানির (জেটিআই) কারখানা খোলা রাখার বিশেষ অনুমতি প্রদান। জানা গেছে, এতেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোন মতামত নেয়া হয়নি। করোনা মোকাবেলায় সরকারের সর্বোচ্চ কমিটির প্রধান স্বাস্থ্য মন্ত্রী হলেও তাঁর মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে ৩ এপ্রিল (শুক্রবার) ও ৫ এপ্রিল (রবিবার) কিভাবে শিল্প মন্ত্রণালয় এধরণের পত্র জারি করে, তা সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। যখন সারাদেশ অবরুদ্ধ অবস্থায়, সকল শিল্প কলকারখানা বন্ধ, তখন সরকারের একটি দায়িত্বশীল সংস্থা হিসাবে শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক এ আদেশ/অনুমতি সরকারের করোনা প্রতিরোধ কার্যক্রমকে ভন্ডুল করে তুলতে পারে। উল্লেখ্য এ নির্দেশনার অনুলিপি সকল বিভাগীয় কমিশনারগণ ও জেলা প্রশাসকদেরকেও প্রেরণ করা হয়েছে।
 
 
মূলত, তামাক কোম্পানির আবেদনের প্রেক্ষিতে শিল্প মন্ত্রণালয় এ পত্র জারি করেছে। যেখানে তামাক কোম্পানিগুলো সরকারকে কত টাকা কর দেয় তা জোরালোভাবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু তাদের উৎপাদিত পণ্য সেবন করে কত মানুষ মারা যায়, কত মানুষ ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসতন্ত্র ও ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগে (যেমন: হাঁপানি, এজমা, সিওপিডি) আক্রান্ত হয়, তার তথ্য দেয় না। তামাকজনিত রোগে অসুস্থ্যদের চিকিৎসায় কত হাজার কোটি টাকা ব্যয়, সেসব তথ্য দেয় না। বলা প্রয়োজন, টোব্যাকো এটলাস ২০১৮ অনুযায়ী বাংলাদেশে ১ লক্ষ ৬১ হাজারের অধিক মানুষ তামাকজনিত রোগে মারা যায়। বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের গবেষণায় বলা হয়েছে, সবরকম তামাক খাত থেকে অর্জিত রাজস্ব আয়ের চাইতেও তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা ব্যয় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। বরং ধূর্ত তামাক কোম্পানিগুলো এসব তথ্য ধামাচাপা দিতে নানামুখী প্রচেষ্টা চালায়। 
 
তামাক কোন খাদ্য দ্রব্য বা ঔষধী পণ্য নয়। তারপরও এমন সঙ্কটময় সময়ে বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলোর বিষ শলাকা উৎপাদন অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে সরকারের একটি দায়িত্বশীল সংস্থা কর্তৃক ধূর্ত তামাক কোম্পানিগুলোর ‘অযৌক্তিক আবদার’ মেনে নেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক! করোনা পরিস্থিতির কারণে ‘লকডাউন’ অবস্থাতেও প্রভাব খাটিয়ে সরকারী দপ্তর থেকে নির্দেশনার চিঠি আদায় করার মাধ্যমে প্রমাণ হয়, সর্ষের মধ্যে ভুত রয়েছে। এখানে তামাক উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কারখানায় কর্মরত সংশ্লিষ্টদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি এখানে মূখ্য নয়। বলা যায়, মানুষের মাঝে তামাক পণ্যের সাথে করোনার বীজ সরবরাহ করছে তারা! 
 
তামাক কোম্পানিগুলোর প্রতারণামূলক কার্যক্রম সম্পর্কে সবারই সচেতন হওয়া প্রয়োজন! ইংল্যান্ডের দৈনিক দি গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, বিএটি তামাক পাতা থেকে করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিস্কারের পরিকল্পনা করছে। বিভিন্ন দেশের সরকার ও নীতিনির্ধারদের দৃষ্টি সরিয়ে নিতে ও বিশ্বব্যাপী তামাক কোম্পানিগুলো ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নিত্যনতুন প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে। এর আগেও ইবোলার সময় তামাক কোম্পানির ভ্যাকসিন আবিস্কারের নামে যা বানানো হয়েছিলো তার অনুমোদন মিলেনি। মূলত, চলমান করোনা প্রাদূর্ভাবে তামাক পণ্য সম্পর্কে মানুষের নেতিবাচক ধারণা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেটি শীতল করার একটি অপচেষ্টা এই ঘোষণা। আমাদের মনে রাখা দরকার, তামাক সেবনের কারণে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীতে বছরে ৮০ লক্ষাধিক মানুষ মারা যায়। 
 
তামাক নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক পরিমন্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান প্রসংশনীয়। তবে, শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক তামাক কোম্পানির পক্ষে দেয়া সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত চলমান করোনা সংক্রমন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াবে ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নেতিবাচক হবে। তামাক কোম্পানি ও তাদের দোসরদের এধরনের কার্যক্রম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ২০৪০ সালের মধ্যে “তামাকমুক্ত বাংলাদেশ” প্রত্যয় বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করবে।
 
দেশের সচেতন মহল শিল্প মন্ত্রণালয়ের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবী জানালেও তামাক কোম্পানির চলমান কার্যক্রমে তার কোন প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে না। জনস্বার্থকে তুচ্ছ করে খোদ সরকারেরই দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ যখন মৃত্যুবিপণনকারী কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করে চলে, তখন মনে হয় ‘সব সম্ভবের দেশ- বাংলাদেশ।’
 
এখনো পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিস্কার হয়নি। করোনা প্রতিরোধ করার জন্য ইমিউন সিস্টেম বা শরীরে রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরী। ধূমপান ও সকল প্রকার তামাক শরীরের গুরত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা নষ্ট করে বিধায় এসকল পণ্য সেবন হতে বিরত থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
 
মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সিগারেটের মত প্রাণঘাতী ক্ষতিকর পণ্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যাবশ্যক। তবে করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় যে লকডাউন পরিস্থিতি চলমান রয়েছে, তাতে তামাক কোম্পানির কারখানাসহ তামাক কোম্পানির কার্যক্রম আপাতত বন্ধ করা জরুরি। আশা করি, শিল্প মন্ত্রণালয় জারিকৃত পত্র বাতিল করে করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি মোকাবেলায় সরকারের সর্বাত্মক কর্মসূচি জোরদার করবে।
 
লেখক: মো. আবু রায়হান
[জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন কর্মী]
ইমেইল: arayhan2010@gmail.com